আমি আমেরিকায় গিয়ে শুনে এলাম

লোকে ওখানেও বলছে:

দিনকাল যা পড়েছে

তুমি তোমার খাবারের কাছে ঠিক সময়ে

পৌঁছতে না পারলে

অন্য একজন পৌঁছে যাবে।

 

আরে, এ তো আমাদের দেশে

গরিব লোকেরা করত।

এখন বছরে তিনবার ধান হয় বলে

একজন ভিখিরি, একজন পাগলের খাবার

কেড়ে নেওয়ার আগে দুবার ভাবে।

 

তবে গতকাল শুনলাম

মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করতেন অংশুমান রায়

কী ভাল, তার অফিস তাকে সপরিবারে

মরিশাস পাঠাল বেড়াতে।

দশদিন বাদে ফিরে এসে দেখল

তার চেয়ারে বসে আছে তার থেকে একটু ফর্সা

তার থেকে একটু লম্বা

তার চেয়ে একটু ঘন চুল অন্য এক

অংশুমান রায়।

ব্যস্ত সমাজের থেকে কবিতার নির্বাসন হয়ে গেছে কবে।

সফল ও সুখী মানুষেরা আজকাল কবিতার ধারও ধারে না,

তারা সকলেই সবকিছু বোঝে, বোঝে জীবনবীমার গল্প;

বোঝে হাসিখুশি, সুড়সুড়ি-মাখা, টিভি সিরিয়াল;

বোঝে ঝোপ বুঝে কোপ মারা, বোঝে হর্ষদ মেহেতা,

বোঝে কতখানি ধান থেকে জন্ম নেয় ঠিক কতখানি চাল,

শুধু কবিতা বোঝে না, বোঝে না যে তার জন্য

                   লজ্জা নেই কোনও,

সুপ্রাচীন সুতীব্র আর্তিতে ভরা মায়াবী শিল্পের দিক থেকে

সম্পূর্ণ ফিরিয়ে পিঠ বেশ আছে সুসভ্য প্রজাতি।

 

শুধু মাঝে মাঝে খুবই নির্জনে কোনও এক পবিত্র মুহূর্তে

প্রাণের ভিতর দিকে বেজে ওঠে বাশিঁ, অলৌকিক সেই বাশিঁ।

রন্ধনে ব্যসনে ব্যস্ত সুখী গৃহকোণ কেঁপে ওঠে,

বিস্মৃতা রাধার সমস্ত হৃদয় জুড়ে কোটালের বান ডাকে

উথাল পাথাল, খুব মাঝে মাঝে এরকম হয়, হয় নাকি?

 

ভুলে যাওয়া অতিপূর্ব প্রপিতামহের মতো রক্তের

                   ভিতরে ঢুকে পড়ে

কবিতার অসম্ভব বীজগুলি প্রতিশোধ নেয়।

সব কিছু সমস্ত অর্জন সুখ-স্বস্তি-স্বচ্ছলতা অর্থহীন মনে হয়।

 

বাশিঁ ডাকে, বাশিঁ বাজে, সেই বাশিঁ বাজে,

জীবন আচ্ছন্ন করা বাশিঁ বাজে যমুনা-পুলিনে।

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের

জলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট

          উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়

 

বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে

নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো

          হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সুক্ষ্মতায়

বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট

উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে

 

ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত

মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট

          শহরের প্রধান সড়কে

          কারখানার চিমনি-চুড়োয়

          গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে

উড়ছে, উড়ছে অবিরাম

আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,

চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়

 

আমাদের দূর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা

সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;

আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা

স্মৃতির স্নায়ুরা দীপ্র কুকুরের দাঁত,

বিষদাঁত বিঁধিয়েছে অস্তিত্বের পায়ে,

রক্তে সেই যন্ত্রণার আততায়ী তাত

উন্মাদ পাক খায়; ডাইনে আর বাঁয়ে

বিভীষিকা-জলাতঙ্ক-বিকল স্নায়ুরা:

ভয়াল কুকুর দিনেরাত্রে ছুটে আসে;

দুচোখে বেঁধেছে বাসা কুটিল মৃত্যুরা,

ক্ষিপ্ত কুকুরের মুখ চোখে শুধু ভাসে।

 

স্মৃতির স্নায়ুরা দীর্ণ জীবিত করাত-

অহোরাত্র ঘুরে যায় মাংসের নিচে,

শরীরের খাঁজে তার আততায়ী দাঁত

ছিঁড়ে নেয় মেদ ত্বক ক্ষুধার্ত কিরিচে।

নিদ্রাহীন অন্ধকার সামনে পিছনে

টুঁটি চেপে ধরে আছে আমার আয়ুর;

কান্তা, তুমি তো ছিলে জীবনের গানে:

সে স্মৃতিরা ছেঁড়ে আজ স্বপ্ন স্নায়ুর।

 

জুন 2009
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহঃ শুক্র
« জানু    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031