বিষ্ণু বিশ্বাস

‘শুধু মৃতদের গল্প কত আর কাঁধে ঝুলে যাবে/ এবার নিষ্কৃতি পেলে, শান্তি অন্বেষণে মহাকাশে/গিয়ে, দু’টুকরো লোহা ঠুকে আগুন জ্বালিয়ে দেব/ অসহ অসীম শব পুড়ে হোক ছাই পুড়ে ছাই।’– এ কবিতার লাইনগুলো যিনি লিখেছিলেন তিনি অনেক বছর ছিলেন নিরুদ্দেশ, লোকচক্ষুর আড়ালে। তিনি আশির দশকের কবি বিষ্ণু বিশ্বাস।
Bishnu Biswas

তিনি রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থা।

আশির দশকের এ কবি জন্মগ্রহণ করেন ঝিনাইদহ জেলার বিষয়খালিতে ১৯৬২ সালের ২৯ মে। ঝিনাইদহের নলডাঙা ভূষণ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৭৯’ সালে এস এস সি এবং ৮১ সালে ঝিনাইদহ সরকারি কে সি কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে। সেখানে পড়ার সময় তিনি যুক্ত হন ছোটকাগজ ‘পেঁচা’ সম্পাদনার সঙ্গে। পরে ৮৫ সালে অনার্স পাশ করে চলে আসেন ঢাকায়।

এখানে এসেই ভিড়ে যান সমসাময়িক ঢাকার কবিদের সঙ্গে। এলোমেলো বোহেমিয়ান জীবনযাপন করতে গিয়ে যেন হোঁচট খান। অনেক সময় আর্থিক সংকটেও পড়েন। এরই মধ্যে শুরু হয় ভারতে বাবরি মসজিদ হামলা। এর প্রভাব পড়ে তখন বাংলাদেশেও। রাষ্ট্রের ওই পরিস্থিতিতে বিষ্ণু কি রকম আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেলেন।

একটা সাদা গাড়ি অথবা ছুরি হাতে কেউ তাকে তাড়া করে ফিরছে— এ রকম ভীতিবিচলিত হয়ে বেরিয়ে পড়তেন মাঝে মাঝে। অসংলগ্নতা বেড়ে যাওয়ায় তাকে তখন নিয়ে যাওয়া হয় মনোচিকিৎসকের কাছে। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত। ডাক্তার সার্বক্ষণিক দেখাশোনার ওপর জোর দিলেন। কিন্তু সব নজরদারি ফাঁকি দিযে হঠাৎ তিনি উধাও হয়ে যান। এরপর মাঝে মাঝেই তিনি এভাবে উধাও হয়ে যেতেন আবার ফিরে আসতেন।
ইতোমধ্যে ১৯৯৩ সালে একদিন তিনি চলে যান পশ্চিমবঙ্গে, তারপর বহু বছর তার তেমন কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি।

২০১০ সালে হঠাৎ শোনা যায় তিনি বনগাঁয় আছেন। শারীরিকভাবে খুব অসুস্থ এবং কথা একদমই বলেন না। পশ্চিমবঙ্গের কবি তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম বিষ্ণুর খোঁজ জানান। সম্প্রতি কবি বিভাস রায়চৌধুরী তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি মোবাইল ফোনে তার কয়েকটি ছবিও তুলেছেন। ছবি দেখে অবাক হতে হয়, তার আগের কান্তিমান চেহারার সাথে বতর্মানে ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত চেহারার অনেক ফারাক। বিষ্ণু যখন নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন ১৯৯৩ সালে, তখন তার বয়স ছিল ৩১ বছর। বর্তমানে তার বয়স ৪৯। ছবিতে সেই বয়সের ছাপ পড়েছে। চুল দাড়ি পেকে গেছে, অযতেœ অবহেলায় ভাঙ্গা গালে রুগ্নতার ছাপ।

কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের এক চিঠির মাধ্যমে জানা গেল, কলকাতা থেকে কবি ও সঙ্গীতকার মিতুল দত্তসহ ঢাকা থেকে তাঁর বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরা চেষ্টা করছেন তাঁর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের। আমরা কামনা করছি খুবই শিগগিরই কবি বিষ্ণু বিশ্বাস ফিরে আসবেন স্বাভাবিক জীবনে।

এখন পর্যন্ত বিষ্ণু বিশ্বাসের প্রকাশিত কবিতার বই মাত্র একটি ‘ভোরের মন্দির’। আশির দশকে প্রকাশিত প্রসূন, গাণ্ডীব, পেঁচা এবং নব্বই দশকে প্রকাশিত নদী, দ্রষ্টব্য ইত্যাদি ছোটকাগজে তার কবিতা প্রকাশিত হত। বিষ্ণুর নিরুদ্দেশের পর তার বন্ধুদের আগ্রহে নিশাত জাহান রানার ভূমিকাসহ ২০০১ সালে প্রকাশ করা হয় ‘ভোরের মন্দির’।

Source: http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=709a76e418675b743018a0e6824b5c03&nttl=55706

 

সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি বিষ্ণু বিশ্বাস

ইচক দুয়েন্দে | ৩১ মে ২০১০ ৮:০৯ অপরাহ্ন

 

তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার
কত রঙে রঙ করা।
মোর সাথে ছিল দুঃখের ফলের ভার
অশ্রুর রসে ভরা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 

বিষ্ণুর সঙ্গে ষোল বছর দেখা নেই। শেষ দেখা সংসদ ভবনের কোনায় বিশাল রাস্তায়। আমরা একটা বেবিট্যাক্সিতে ছিলাম। যাত্রা করেছিলাম মালিবাগ চৌধুরী পাড়া থেকে। আমি নেমে গেলাম। বিষ্ণুকে নিয়ে বেবিট্যাক্সিটা চলে গেল গাবতলির দিকে। তাঁর রাজশাহী যাবার কথা।

সেই-ই তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা।

রাজশাহীতে সে মাসখানেক ছিল। তারপর যাত্রা করেছিল ঝিনাইদহ। অবশিষ্ট সবকিছু শোনা কথা। ঝিনাইদহে তাঁর পৈত্রিক গ্রাম। তাঁর বাবা অনেক দিন আগে পরলোকে। শুনেছিলাম তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন । তাঁর মা থাকতেন গ্রামে। ভাইবোন ছিল না। গ্রামে গিয়ে বিষ্ণু দেখেন তাঁর মা পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। বিষ্ণুও যাত্রা করেছিল সেখানে।

বছর কয়েক পরে শুনেছিলাম, বিষ্ণু সেখানে বিয়ে করেছিল। একটি বাচ্চা হয়েছিল। তারপর সে আত্মহত্যা করেছিল। শুনেছিলাম আবার, সে আত্মহত্যা করে নাই, পথে পথে সে কাগজ কুড়োচ্ছে।

ঘন ঝাঁকড়া চুল, মাঝে সিঁথি কাটা, দীর্ঘদেহী স্বপ্নালু চোখ বিষ্ণুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৮৪/৮৫ সালে। কবি অসীম কুমার দাস পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বিষ্ণুর কণ্ঠস্বর ভরাট গভীর স্পষ্ট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বনন’-এর তারকা আবৃত্তিকার সে তখন।

আমি তখন গল্প লেখা শিখছি। বিষ্ণু কবিতা লেখা।

বিষ্ণু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়ত। আমি পড়তাম না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর আমাকে টানত। বিষ্ণু টানত। অসীম টানতেন। আড্ডা দিতে যেতাম। কবিতা নিয়ে কথা হত। উপন্যাস নিয়ে। কে বড় কে মহান। কে হারিয়ে যাবে আগামীকাল, কে থাকবে জুড়ে মহাকাল। এবং আলাপ হত প্রেম নিয়ে।

বিষ্ণু সদালাপি। তাঁর পথে পথে চেনা তরুণ-তরুণী। সহজেই সে মিশে যেতে পারে সবার সঙ্গে। কলকাতা বেড়িয়ে এসেছে সে অনেকবার। সমসাময়িক বাংলা কবিতার সঙ্গে তাঁর সাবলীল পরিচয়। জীবনানন্দ তাঁর প্রিয়। রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ে। মন ভাল থাকলে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে মন তাঁর ভালই থাকত, গুনগুন করত রবীন্দ্র সঙ্গীত। ‘ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভাল।’

জামা ইন করত। জিনস ছিল তার প্রিয়। কেডস পড়ত। চুল লম্বা।

একটু সময় নিয়ে স্নান করত। নাস্তা করত কিছুটা দেরিতে। প্রথম পরিচয়ের সময়ে ১০/১১টার দিকে। শেষ দিনগুলোয় ১২/১টার দিকে দুপুরে। নিজেকে ঠিকঠাক করে বেরুতে সে একটু সময় নিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় তাঁর মন ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক সব নিয়ম মেনে চলায় সে ছিল বিরক্ত। যদ্দুর মনে পড়ে সাবসিডিয়ারি সময়মত তাঁর করা হয়ে উঠেছিল না। পরে করে নেয়। অনার্স শেষ করেছিল । কিন্তু সনদ সম্ভবত তুলেছিল না।

তার পথে পথে প্রেম ছড়ানো ছিল। যেখানেই সে যেত আশেপাশের মেয়েরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আসত। চোখাচোখি করত। গান করত। যখন সে চলে যেত তাদের মনে দুঃখ হত। সে খেয়ালি মানুষ, ভুলে যেত, নতুন কেউ তাঁকে টানত।

এক পাতলা শ্যামলা তরুণী যিনি হাসলে তার নাসারন্ধ্রও হেঁসে উঠত, বিষ্ণু তাঁর প্রেমে মগ্ন হল। মগ্ন আচ্ছন্ন একটু পাগল করা। তরুণী স্বল্পভাষী, মিতবাক। তাঁর টিনএজ থেকে দুর্দান্ত কিংবদন্তি এক প্রেম ছিল। সেই প্রেম এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। তবুও তিনি বিষ্ণুকে সময় দিতেন।

তাঁরা দু’জন রিক্সায় ঘুরতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শহরে। বিষ্ণু গান গাইত, যেন ঢলে পড়তে চাইত তাঁর গায়ে। তরুণী ছিলেন নিরব, বড্ড নিরব, দূর থেকে তাই আমাদের মনে হত।

বিষ্ণু কি তাঁর ভালবাসার কথা আমাদের আটখানা করে বলত? না প্রায় একদম নয়। তাঁর ভালবাসা ছিল অন্যরকম। কামনা বাসনা সেখানে ছিল অপ্রধান, বিয়ে করে ঘর বাঁধবার বাসনা বোধ হয় সে স্বপ্নেও ভাবত না। মর্ত্য মানুষের মতো নয়। সে ভালবাসা চাইত। অন্যরকম ভালবাসা। তাঁর এই প্রেম ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। কেন আমি জানি না। এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মতিহার সবুজ চত্বর ফেলে রেখে সে রাজশাহী শহরে আমাদের সঙ্গে অনেক বেশি সময় কাটাতে শুরু করল।

তখন আমরা ভাবলাম পেঁচা বের করব। প্রচুর বিপুল চা সিগারেট খেয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রেসে ছাপা ও কাগজের দাম বাকি রেখে আমরা পেঁচা প্রথম খণ্ড বের করলাম।

বিষ্ণু-র লেখা সম্ভবত পেঁচাতেই প্রথম প্রকাশিত হল।

পেঁচা প্রকাশের সময়, যাকে বলে মুক্তোর মত হাতের লেখা নিয়ে এক তরুণী অমাদের জগতে উঁকি দিলেন। যাঁর হৃদয়ে তিনি অনুরণন তুলতে চাইলেন, তিনি তাঁর হৃদয়ে কোনো স্পন্দন বোধ করতে পারলেন না। তাঁর হস্তলিপি বিধৃত কথাগুলি বিষ্ণুর হৃদয়ে স্পন্দন জাগাল। বিষ্ণু প্রেমে পড়ল, ভালবাসল তাঁকে নিজের চেয়ে বেশি।

তিনি ছিলেন মেধাবী, একটু খর্বকায়, কালো পৌরানিক দেবী, যেন। বিষ্ণু তাঁকে গোটা গোটা সৃষ্টিশীল হাতের লেখায় হৃদয়ের সব আবেগ ঢেলে চিঠি লিখল। তিনি থাকতেন দূরে। উত্তর দিতেন বিষ্ণুর চিঠির। প্রেমের নয়।

১৯৮৮ সাল। আমি ঢাকায় চলে গেলাম। পরে পরে বিষ্ণুও ঢাকায় এল।পেঁচার আরেকটি খণ্ড বের করবার জন্য বিষ্ণুর ভীষণ জেদ। আমার ইচ্ছে করছিল না। শেষে রাজি হলাম কিন্তু লেখা দিতে চাইলাম না।

এক রাতে আমরা মালিবাগ চৌধুরী পাড়ার রাস্তায় হাঁটছিলাম। যেখানে একটা ছোট্ট বাসায় আমরা থাকতাম তার কাছে। বিষ্ণু আমার পেঁচায় না-লিখবার ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করে অশ্রুভেজা অবেগ প্রকাশ করল। আমি রাজি হলাম লিখতে। সাত দিন কাজ থেকে ছুটি নিয়ে ’ধূলিযুদ্ধ’ পুনর্লিখন করলাম।

পেঁচা ২য় খণ্ড বের হল।

তারপর আমরা আরও ৬ বছর ছিলাম ঢাকায় । কিছুদিন এক সঙ্গে। তারপর বিচ্ছিন্ন। বিষ্ণু তাঁর নূতন ডেরায়।

সেই দিনগুলোয় বিষ্ণু’র অনেক নূতন বন্ধু। আমারও।

বিষ্ণু তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে, আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম।

পুরানো বন্ধুরা ভাইবোনের মতো হয়ে ওঠে, যদি বিশ্বাস ও ভালবাসা থাকে।

ঢাকা ছেড়ে যাবার আগে শেষ তিন মাস বিষ্ণু আবার আমার সঙ্গে ছিল। বিষ্ণু ঢাকা ছেড়ে চলে যাবার চার/পাঁচ মাস পরে আমিও ঢাকা ছেড়ে চলে আসি।

আচরণে কর্মে কথায় বিষ্ণু নিঁখুত সুন্দর। ‘নিঁখুত’ এর বদলে অন্য একটি শব্দ লিখতে পারলে ভাল লাগত, এখন মনে এল না।

সুন্দর মানুষ। সুন্দর কবি। লোকপ্রচলিত ধারণা কবি বা শিল্পীরা বিষয়-জ্ঞান রহিত। তাঁদের টাকা ফুরিয়ে যায়, প্রেম ব্যর্থ হয়, সংসার তাঁদের তাড়িয়ে দেয়। যাঁরা কবি শিল্পীরূপে খ্যাতি প্রতিপত্তি পান প্রায়শই তাঁরা এর বিপরীত। তবুও লোকপ্রচলিত ধারণাটার একটা সত্যতা থেকে যায়, কারণ অধিকাংশ কবি শিল্পীর কাছে খ্যাতি প্রতিপত্তি ধরা দেয় না। তারা হতদরিদ্র অপরিচিত থেকে যান। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বার্ধক্যে পৌঁছে আর অতি নগণ্য কেউ কেউ পান মৃত্যুর পরে সম্মান। সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি এই শেষোক্তদের দলে। যাঁর নাম বিষ্ণু বিশ্বাস।

আমার বিশ্বাস বিষ্ণু বেঁচে আছে। মনে হয় হিমালয়ের কোলে কোথাও। একদিন সে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে। যখন হয়ত আমি থাকব না।

বিষ্ণু আমাকে বলেছিল, ‘তুমি আমার জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধু।’

আমি বলি, ‘বন্ধু দেখা হবে জন্মান্তরে।’

মে ২০১০

ichokduende@yahoo.com

Source: http://arts.bdnews24.com/?p=2872

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s