You are currently browsing the category archive for the ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ category.

বাদল দিনের প্রথম কদমফুল

আমায় করেছ দান,

আমি তো দিয়েছি ভরা শ্রাবণের

মেঘমল্লারগান।

সজল ছায়ার অন্ধকারে

ঢাকিয়া তারে

এনেছি সুরের শ্যামল খেতের

প্রথম সোনার ধান।

আজ এনে দিলে যাহা

হয়তো দিবে না কাল,

রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।

স্মৃতিবন্যার উছল প্লাবনে

আমার এ গান শ্রাবণে শ্রাবণে

ফিরিয়া ফিরিয়া বাহিবে তরণী

ভরি তব সম্মান।

 

 

  শান্তিনিকেতন, ১০। ১। ৪০

কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা

মনে মনে।

মেলে দিলেম গানের সুরের এই ডানা

মনে মনে।

তেপান্তরের পাথার পেরোই রূপকথার,

পথ ভুলে যাই দূর পারে সেই চুপকথার,

পারুলবনের চম্পারে মোর হয় জানা

মনে মনে।

সূর্য যখন অস্তে পড়ে ঢুলি

মেঘে মেঘে আকাশকুসুম তুলি।

সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় মিশে

যাই ভেসে দূর দিশে,

পরীর দেশের বদ্ধ দুয়ার দিই হানা

মনে মনে।

 

 

  শান্তিনিকেতন, ১০। ১। ৪০

ওরে  নবীন, ওরে আমার কাঁচা,

ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,

আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।

রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে

আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,

সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে

পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা।

আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

 

খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায়;

আর তো কিছুই নড়ে না রে

ওদের ঘরে, ওদের ঘরের দাওয়ায়।

ওই যে প্রবীণ, ওই যে পরম পাকা,

চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা,

ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা

অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়।

আয় জীবন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

 

বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ,

দেখে না যে বাণ ডেকেছে

জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ।

চলতে ওরা চায় না মাটির ছেলে

মাটির ‘পরে চরণ ফেলে ফেলে,

আছে অচল আসনখানা মেলে

যে যার আপন উচ্চ বাঁশের মাচায়,

আয় অশান্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

 

তোরে হেথায় করবে সবাই মানা।

হঠাৎ আলো দেখবে যখন

ভাববে এ কী বিষম কাণ্ডখানা।

সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে,

শয়ন ছেড়ে আসবে ছুটে বেগে,

সেই সুযোগে ঘুমের থেকে জেগে

লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায়।

আয় প্রচণ্ড, আয় রে আমার কাঁচা।

 

শিকল-দেবীর ওই যে পূজাবেদী

চিরকাল কি রইবে খাড়া।

পাগলামি তুই আয় রে দুয়ার ভেদি।

ঝড়ের মাতন, বিজয়-কেতন নেড়ে

অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে,

ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে

ভুলগুলো সব আন্‌ রে বাছা-বাছা।

আয় প্রমত্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

 

আন্‌ রে টেনে বাঁধা-পথের শেষে।

বিবাগী কর্‌ অবাধপানে,

পথ কেটে যাই অজানাদের দেশে।

আপদ আছে, জানি অঘাত আছে,

তাই জেনে তো বক্ষে পরান নাচে,

ঘুচিয়ে দে ভাই পুঁথি-পোড়োর কাছে

পথে চলার বিধিবিধান যাচা।

আয় প্রমুক্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

 

চিরযুবা তুই যে চিরজীবী,

জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে

প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি।

সবুজ নেশায় ভোর করেছি ধরা,

ঝড়ের মেঘে তোরি তড়িৎ ভরা,

বসন্তেরে পরাস আকুল-করা

আপন গলার বকুল-মাল্যগাছা,

আয় রে অমর, আয় রে আমার কাঁচা।

 

 

  শান্তিনিকেতন, ১৫ বৈশাখ, ১৩২১

আমি অন্তঃপুরের মেয়ে,

চিনবে না আমাকে।

তোমার শেষ গল্পের বইটি পড়েছি, শরৎবাবু,

“বাসি ফুলের মালা’।

তোমার নায়িকা এলোকেশীর মরণ-দশা ধরেছিল

পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে।

পঁচিশ বছর বয়সের সঙ্গে ছিল তার রেষারেষি,

দেখলেম তুমি মহদাশয় বটে–

জিতিয়ে দিলে তাকে।

 

নিজের কথা বলি।

বয়স আমার অল্প।

একজনের মন ছুঁয়েছিল

আমার এই কাঁচা বয়সের মায়া।

তাই জেনে পুলক লাগত আমার দেহে–

ভুলে গিয়েছিলেম, অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে আমি।

আমার মতো এমন আছে হাজার হাজার মেয়ে,

অল্পবয়সের মন্ত্র তাদের যৌবনে।

 

তোমাকে দোহাই দিই,

একটি সাধারণ মেয়ের গল্প লেখো তুমি।

বড়ো দুঃখ তার।

তারও স্বভাবের গভীরে

অসাধারণ যদি কিছু তলিয়ে থাকে কোথাও

কেমন করে প্রমাণ করবে সে,

এমন কজন মেলে যারা তা ধরতে পারে।

কাঁচা বয়সের জাদু লাগে ওদের চোখে,

মন যায় না সত্যের খোঁজে,

আমরা বিকিয়ে যাই মরীচিকার দামে।

 

কথাটা কেন উঠল তা বলি।

মনে করো তার নাম নরেশ।

সে বলেছিল কেউ তার চোখে পড়ে নি আমার মতো।

এতবড়ো কথাটা বিশ্বাস করব যে সাহস হয় না,

না করব যে এমন জোর কই।

 

একদিন সে গেল বিলেতে।

চিঠিপত্র পাই কখনো বা।

মনে মনে ভাবি, রাম রাম! এত মেয়েও আছে সে দেশে,

এত তাদের ঠেলাঠেলি ভিড়!

আর তারা কি সবাই অসামান্য–

এত বুদ্ধি, এত উজ্জ্বলতা।

আর তারা সবাই কি আবিষ্কার করেছে এক নরেশ সেনকে

স্বদেশে যার পরিচয় চাপা ছিল দশের মধ্যে।

 

গেল মেলের চিঠিতে লিখেছে

লিজির সঙ্গে গিয়েছিল সমুদ্রে নাইতে–

বাঙালি কবির কবিতা ক’ লাইন দিয়েছে তুলে

সেই যেখানে উর্বশী উঠছে সমুদ্র থেকে–

তার পরে বালির ‘পরে বসল পাশাপাশি–

সামনে দুলছে নীল সমুদ্রের ঢেউ,

আকাশে ছড়ানো নির্মল সূর্যালোক।

লিজি তাকে খুব আস্তে আস্তে বললে,

“এই সেদিন তুমি এসেছ, দুদিন পরে যাবে চলে;

ঝিনুকের দুটি খোলা,

মাঝখানটুকু ভরা থাক্‌

একটি নিরেট অশ্রুবিন্দু দিয়ে–

দুর্লভ, মূল্যহীন।’

কথা বলবার কী অসামান্য ভঙ্গি।

সেইসঙ্গে নরেশ লিখেছে,

“কথাগুলি যদি বানানো হয় দোষ কী,

কিন্তু চমৎকার–

হীরে-বসানো সোনার ফুল কি সত্য, তবুও কি সত্য নয়।’

বুঝতেই পারছ

একটা তুলনার সংকেত ওর চিঠিতে অদৃশ্য কাঁটার মতো

আমার বুকের কাছে বিঁধিয়ে দিয়ে জানায়–

আমি অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে।

মূল্যবানকে পুরো মূল্য চুকিয়ে দিই

এমন ধন নেই আমার হাতে।

ওগো, নাহয় তাই হল,

নাহয় ঋণীই রইলেম চিরজীবন।

 

পায়ে পড়ি তোমার, একটা গল্প লেখো তুমি শরৎবাবু,

নিতান্তই সাধারণ মেয়ের গল্প–

যে দুর্ভাগিনীকে দূরের থেকে পাল্লা দিতে হয়

অন্তত পাঁচ-সাতজন অসামান্যার সঙ্গে–

অর্থাৎ, সপ্তরথিনীর মার।

বুঝে নিয়েছি আমার কপাল ভেঙেছে,

হার হয়েছে আমার।

কিন্তু তুমি যার কথা লিখবে

তাকে জিতিয়ে দিয়ো আমার হয়ে,

পড়তে পড়তে বুক যেন ওঠে ফুলে।

ফুলচন্দন পড়ুক তোমার কলমের মুখে।

 

তাকে নাম দিয়ো মালতী।

ওই নামটা আমার।

ধরা পড়বার ভয় নেই।

এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে,

তারা সবাই সামান্য মেয়ে।

তারা ফরাসি জর্মান জানে না,

কাঁদতে জানে।

 

কী করে জিতিয়ে দেবে।

উচ্চ তোমার মন, তোমার লেখনী মহীয়সী।

তুমি হয়তো ওকে নিয়ে যাবে ত্যাগের পথে,

দুঃখের চরমে, শকুন্তলার মতো।

দয়া কোরো আমাকে।

নেমে এসো আমার সমতলে।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাত্রির অন্ধকারে

দেবতার কাছে যে অসম্ভব বর মাগি–

সে বর আমি পাব না,

কিন্তু পায় যেন তোমার নায়িকা।

রাখো-না কেন নরেশকে সাত বছর লণ্ডনে,

বারে বারে ফেল করুক তার পরীক্ষায়,

আদরে থাক্‌ আপন উপাসিকামণ্ডলীতে।

ইতিমধ্যে মালতী পাস করুক এম| এ|

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে,

গণিতে হোক প্রথম তোমার কলমের এক আঁচড়ে।

কিন্তু ওইখানেই যদি থাম

তোমার সাহিত্যসম্রাট নামে পড়বে কলঙ্ক।

আমার দশা যাই হোক

খাটো কোরো না তোমার কল্পনা।

তুমি তো কৃপণ নও বিধাতার মতো।

মেয়েটাকে দাও পাঠিয়ে য়ুরোপে।

সেখানে যারা জ্ঞানী, যারা বিদ্বান, যারা বীর,

যারা কবি, যারা শিল্পী, যারা রাজা,

দল বেঁধে আসুক ওর চার দিকে।

জ্যোতির্বিদের মতো আবিষ্কার করুক ওকে–

শুধু বিদুষী ব’লে নয়, নারী ব’লে।

ওর মধ্যে যে বিশ্বজয়ী জাদু আছে

ধরা পড়ুক তার রহস্য, মূঢ়ের দেশে নয়–

যে দেশে আছে সমজদার, আছে দরদি,

আছে ইংরেজ জর্মান ফরাসি।

মালতীর সম্মানের জন্য সভা ডাকা হোক-না,

বড়ো বড়ো নামজাদার সভা।

মনে করা যাক সেখানে বর্ষণ হচ্ছে মুষলধারে চাটুবাক্য,

মাঝখান দিয়ে সে চলেছে অবহেলায়–

ঢেউয়ের উপর দিয়ে যেন পালের নৌকো।

ওর চোখ দেখে ওরা করছে কানাকানি,

সবাই বলছে ভারতবর্ষের সজল মেঘ আর উজ্জ্বল রৌদ্র

মিলেছে ওর মোহিনী দৃষ্টিতে।

(এইখানে জনান্তিকে বলে রাখি

সৃষ্টিকর্তার প্রসাদ সত্যই আছে আমার চোখে।

বলতে হল নিজের মুখেই,

এখনো কোনো য়ুরোপীয় রসজ্ঞের

সাক্ষাৎ ঘটে নি কপালে।)

নরেশ এসে দাঁড়াক সেই কোণে,

আর তার সেই অসামান্য মেয়ের দল।

 

আর তার পরে?

তার পরে আমার নটেশাকটি মুড়োল,

স্বপ্ন আমার ফুরোল।

হায় রে সামান্য মেয়ে!

হায় রে বিধাতার শক্তির অপব্যয়!

 

 

  ২৯ শ্রাবণ, ১৩৩৯

কিনু গোয়ালার গলি।

দোতলা বাড়ির

লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর

পথের ধারেই।

লোনা-ধরা দেওয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,

মাঝে মাঝে স্যাঁতা-পড়া দাগ।

 

মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি

সিদ্ধিদাতা গণেশের

দরজার ‘পরে আঁটা।

আমি ছাড়া ঘরে থাকে আরেকটা জীব

এক ভাড়াতেই,

সেটা টিকটিকি।

তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,

নেই তার অন্নের অভাব।

বেতন পঁচিশ টাকা,

সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।

খেতে পাই দত্তদের বাড়ি

ছেলেকে পড়িয়ে।

শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,

সন্ধেটা কাটিয়ে আসি,

আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।

এঞ্জিনের ধস্‌ ধস্‌,

বাঁশির আওয়াজ,

যাত্রীর ব্যস্ততা,

কুলি-হাঁকাহাঁকি।

সাড়ে দশ বেজে যায়,

তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার।

 

ধলেশ্বরীনদীতীরে পিসিদের গ্রাম।

তাঁর দেওরের মেয়ে,

অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।

লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল–

সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।

মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,

আমি তথৈবচ।

ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসাযাওয়া–

পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।

 

বর্ষা ঘন ঘোর।

ট্রামের খরচা বাড়ে,

মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।

গলিটার কোণে কোণে

জমে ওঠে পচে ওঠে

আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,

মাছের কান্‌কা,

মরা বেড়ালের ছানা,

ছাইপাঁশ আরো কত কী যে!

ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া

মাইনের মতো,

বহু ছিদ্র তার।

আপিসের সাজ

গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,

সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।

বাদলের কালো ছায়া

স্যাঁৎসেঁতে ঘরটাতে ঢুকে

কলে-পড়া জন্তুর মতন

মূর্ছায় অসাড়।

দিন রাত মনে হয়, কোন্‌ আধমরা

জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।

 

গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু,

যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,

বড়ো বড়ো চোখ,

শৌখিন মেজাজ।

কর্নেট বাজানো তার শখ।

মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে

এ গলির বীভৎস বাতাসে–

কখনো গভীর রাতে,

ভোরবেলা আধো অন্ধকারে,

কখনো বৈকালে

ঝিকিমিকি আলোয় ছায়ায়।

হঠাৎ সন্ধ্যায়

সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,

সমস্ত আকাশে বাজে

অনাদি কালের বিরহবেদনা।

তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে

এ গলিটা ঘোর মিছে,

দুর্বিষহ, মাতালের প্রলাপের মতো।

হঠাৎ খবর পাই মনে

আকবর বাদশার সঙ্গে

হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।

বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে

ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে

এক বৈকুণ্ঠের দিকে।

এ গান যেখানে সত্য

অনন্ত গোধূলিলগ্নে

সেইখানে

বহি চলে ধলেশ্বরী;

তীরে তমালের ঘন ছায়া;

আঙিনাতে

যে আছে অপেক্ষা ক’রে, তার

পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।

 

 

  ২৫ আষাঢ়, ১৩৩৯

নাম তার কমলা,

দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা।

সে চলেছিল ট্রামে, তার ভাইকে নিয়ে কলেজের রাস্তায়।

আমি ছিলেম পিছনের বেঞ্চিতে।

মুখের এক পাশের নিটোল রেখাটি দেখা যায়,

আর ঘাড়ের উপর কোমল চুলগুলি খোঁপার নীচে।

কোলে তার ছিল বই আর খাতা।

যেখানে আমার নামবার সেখানে নামা হল না।

 

এখন থেকে সময়ের হিসাব করে বেরোই–

সে হিসাব আমার কাজের সঙ্গে ঠিকটি মেলে না,

প্রায় ঠিক মেলে ওদের বেরোবার সময়ের সঙ্গে,

প্রায়ই হয় দেখা।

মনে মনে ভাবি, আর-কোনো সম্বন্ধ না থাক্‌,

ও তো আমার সহযাত্রিণী।

নির্মল বুদ্ধির চেহারা

ঝক্‌ঝক্‌ করছে যেন।

সুকুমার কপাল থেকে চুল উপরে তোলা,

উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টি নিঃসংকোচ।

মনে ভাবি একটা কোনো সংকট দেখা দেয় না কেন,

উদ্ধার করে জন্ম সার্থক করি–

রাস্তার মধ্যে একটা কোনো উৎপাত,

কোনো-একজন গুণ্ডার স্পর্ধা।

এমন তো আজকাল ঘটেই থাকে।

কিন্তু আমার ভাগ্যটা যেন ঘোলা জলের ডোবা,

বড়ো রকম ইতিহাস ধরে না তার মধ্যে,

নিরীহ দিনগুলো ব্যাঙের মতো একঘেয়ে ডাকে–

না সেখানে হাঙর-কুমিরের নিমন্ত্রণ, না রাজহাঁসের।

একদিন ছিল ঠেলাঠেলি ভিড়।

 

কমলার পাশে বসেছে একজন আধা-ইংরেজ।

ইচ্ছে করছিল, অকারণে টুপিটা উড়িয়ে দিই তার মাথা থেকে,

ঘাড়ে ধরে তাকে রাস্তায় দিই নামিয়ে।

কোনো ছুতো পাই নে, হাত নিশ্‌পিশ্‌ করে।

এমন সময়ে সে এক মোটা চুরোট ধরিয়ে

টানতে করলে শুরু।

কাছে এসে বললুম, “ফেলো চুরোট।’

যেন পেলেই না শুনতে,

ধোঁওয়া ওড়াতে লাগল বেশ ঘোরালো করে।

মুখ থেকে টেনে ফেলে দিলেম চুরোট রাস্তায়।

হাতে মুঠো পাকিয়ে একবার তাকালো কট্‌মট্‌ ক’রে–

আর কিছু বললে না, এক লাফে নেমে গেল।

বোধ হয় আমাকে চেনে।

আমার নাম আছে ফুটবল খেলায়,

বেশ একটু চওড়া গোছের নাম।

লাল হয়ে উঠল মেয়েটির মুখ,

বই খুলে মাথা নিচু করে ভান করলে পড়বার।

হাত কাঁপতে লাগল,

কটাক্ষেও তাকালে না বীরপুরুষের দিকে।

আপিসের বাবুরা বললে, “বেশ করেছেন মশায়।’

একটু পরেই মেয়েটি নেমে পড়ল অজায়গায়,

একটা ট্যাক্সি নিয়ে গেল চলে।

 

পরদিন তাকে দেখলুম না,

তার পরদিনও না,

তৃতীয় দিনে দেখি

একটা ঠেলাগাড়িতে চলেছে কলেজে।

বুঝলুম, ভুল করেছি গোঁয়ারের মতো।

ও মেয়ে নিজের দায় নিজেই পারে নিতে,

আমাকে কোনো দরকারই ছিল না।

আবার বললুম মনে মনে,

ভাগ্যটা ঘোলা জলের ডোবা–

বীরত্বের স্মৃতি মনের মধ্যে কেবলই আজ আওয়াজ করছে

কোলাব্যাঙের ঠাট্টার মতো।

ঠিক করলুম ভুল শোধরাতে হবে।

 

খবর পেয়েছি গরমের ছুটিতে ওরা যায় দার্জিলিঙে।

সেবার আমারও হাওয়া বদলাবার জরুরি দরকার।

ওদের ছোট্ট বাসা, নাম দিয়েছে মতিয়া–

রাস্তা থেকে একটু নেমে এক কোণে

গাছের আড়ালে,

সামনে বরফের পাহাড়।

শোনা গেল আসবে না এবার।

ফিরব মনে করছি এমন সময়ে আমার এক ভক্তের সঙ্গে দেখা,

মোহনলাল–

রোগা মানুষটি, লম্বা, চোখে চশমা,

দুর্বল পাকযন্ত্র দার্জিলিঙের হাওয়ায় একটু উৎসাহ পায়।

সে বললে, “তনুকা আমার বোন,

কিছুতে ছাড়বে না তোমার সঙ্গে দেখা না করে।’

মেয়েটি ছায়ার মতো,

দেহ যতটুকু না হলে নয় ততটুকু–

যতটা পড়াশোনায় ঝোঁক, আহারে ততটা নয়।

ফুটবলের সর্দারের ‘পরে তাই এত অদ্ভুত ভক্তি–

মনে করলে আলাপ করতে এসেছি সে আমার দুর্লভ দয়া।

হায় রে ভাগ্যের খেলা!

 

যেদিন নেমে আসব তার দু দিন আগে তনুকা বললে,

“একটি জিনিস দেব আপনাকে, যাতে মনে থাকবে আমাদের কথা–

একটি ফুলের গাছ।’

এ এক উৎপাত। চুপ করে রইলেম।

তনুকা বললে, “দামি দুর্লভ গাছ,

এ দেশের মাটিতে অনেক যত্নে বাঁচে।’

জিগেস করলেম, “নামটা কী?’

সে বললে “ক্যামেলিয়া’।

চমক লাগল–

আর-একটা নাম ঝলক দিয়ে উঠল মনের অন্ধকারে।

হেসে বললেম, “ক্যামেলিয়া,

সহজে বুঝি এর মন মেলে না।’

তনুকা কী বুঝলে জানি নে, হঠাৎ লজ্জা পেলে,

খুশিও হল।

চললেম টবসুদ্ধ গাছ নিয়ে।

দেখা গেল পার্শ্ববর্তিনী হিসাবে সহযাত্রিণীটি সহজ নয়।

একটা দো-কামরা গাড়িতে

টবটাকে লুকোলেম নাবার ঘরে।

থাক্‌ এই ভ্রমণবৃত্তান্ত,

বাদ দেওয়া যাক আরো মাস কয়েকের তুচ্ছতা।

 

পুজোর ছুটিতে প্রহসনের যবনিকা উঠল

সাঁওতাল পরগনায়।

জায়গাটা ছোটো। নাম বলতে চাই নে–

বায়ুবদলের বায়ু-গ্রস্তদল এ জায়গার খবর জানে না।

কমলার মামা ছিলেন রেলের এঞ্জিনিয়র।

এইখানে বাসা বেঁধেছেন

শালবনে ছায়ায়, কাঠবিড়ালিদের পাড়ায়।

সেখানে নীল পাহাড় দেখা যায় দিগন্তে,

অদূরে জলধারা চলেছে বালির মধ্যে দিয়ে,

পলাশবনে তসরের গুটি ধরেছে,

মহিষ চরছে হর্তকি গাছের তলায়–

উলঙ্গ সাঁওতালের ছেলে পিঠের উপরে।

বাসাবাড়ি কোথাও নেই,

তাই তাঁবু পাতলেম নদীর ধারে।

সঙ্গী ছিল না কেউ,

কেবল ছিল টবে সেই ক্যামেলিয়া।

 

কমলা এসেছে মাকে নিয়ে।

রোদ ওঠবার আগে

হিমে-ছোঁওয়া স্নিগ্ধ হাওয়ায়

শাল-বাগানের ভিতর দিয়ে বেড়াতে যায় ছাতি হাতে।

মেঠো ফুলগুলো পায়ে এসে মাথা কোটে,

কিন্তু সে কি চেয়ে দেখে।

অল্পজল নদী পায়ে হেঁটে

পেরিয়ে যায় ও পারে,

সেখানে সিসুগাছের তলায় বই পড়ে।

আর আমাকে সে যে চিনেছে

তা জানলেম আমাকে লক্ষ্য করে না বলেই।

 

একদিন দেখি নদীর ধারে বালির উপর চড়িভাতি করছে এরা।

ইচ্ছে হল গিয়ে বলি, আমাকে দরকার কি নেই কিছুতেই।

আমি পারি জল তুলে আনতে নদী থেকে–

পারি বন থেকে কাঠ আনতে কেটে,

আর, তা ছাড়া কাছাকাছি জঙ্গলের মধ্যে

একটা ভদ্রগোছের ভালুকও কি মেলে না।

 

দেখলেম দলের মধ্যে একজন যুবক–

শট্‌-পরা, গায়ে রেশমের বিলিতি জামা,

কমলার পাশে পা ছড়িয়ে

হাভানা চুরোট খাচ্ছে।

আর, কমলা অন্যমনে টুকরো টুকরো করছে

একটা শ্বেতজবার পাপড়ি,

পাশে পড়ে আছে

বিলিতি মাসিক পত্র।

 

মুহূর্তে বুঝলেম এই সাঁওতাল পরগনার নির্জন কোণে

আমি অসহ্য অতিরিক্ত, ধরবে না কোথাও।

তখনি চলে যেতেম, কিন্তু বাকি আছে একটি কাজ।

আর দিন-কয়েকেই ক্যামেলিয়া ফুটবে,

পাঠিয়ে দিয়ে তবে ছুটি।

সমস্ত দিন বন্দুক ঘাড়ে শিকারে ফিরি বনে জঙ্গলে,

সন্ধ্যার আগে ফিরে এসে টবে দিই জল

আর দেখি কুঁড়ি এগোল কত দূর।

 

সময় হয়েছে আজ।

যে আনে আমার রান্নার কাঠ।

ডেকেছি সেই সাঁওতাল মেয়েটিকে।

তার হাত দিয়ে পাঠাব

শালপাতার পাত্রে।

তাঁবুর মধ্যে বসে তখন পড়ছি ডিটেকটিভ গল্প।

বাইরে থেকে মিষ্টিসুরে আওয়াজ এল, “বাবু, ডেকেছিস কেনে।’

বেরিয়ে এসে দেখি ক্যামেলিয়া

সাঁওতাল মেয়ের কানে,

কালো গালের উপর আলো করেছে।

সে আবার জিগেস করলে, “ডেকেছিস কেনে।’

আমি বললেম, “এইজন্যেই।’

তার পরে ফিরে এলেম কলকাতায়।

 

 

  ২৭ শ্রাবণ, ১৩৩৯

কবি’র সূচী

পৃষ্ঠা

মার্চ 2017
S S M T W T F
« Jan    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
%d bloggers like this: